শুক্রবার, ৩১ Jul ২০২৬, ০৭:৫৮ অপরাহ্ন
আনোয়ার হোসেন .. কালের স্বাক্ষী বহনকারী তেতুলিয়া নদীর তীরে বরিশাল উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল হলো ১০নং চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন । কাল পরিক্রমায় আজ ১০নং চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, খেলাধুলা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার নিজস্ব স্বকীয়তা আজও সমুজ্জ্বল। ২৩ বর্গ কিলোমিটার চন্দ্রমোহন ইউনিয়নটি তিন ভাগের দুই ভাগ ২০ বছর পূর্বেই তেতুলিয়া নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

চন্দ্রমোহন অংশে দুই তীরে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে ভাঙনে ফসলি জমি, ফলের বাগান, রাস্তা ও কয়েক শ বসতভিটাও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনের কারণে হুমকিতে রয়েছে শত শত বাড়িঘর। নদীভাঙন ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিস্তীর্ণ জনপদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অনেক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন গ্রামবাসী।
সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল হাওলাদার জানান, ইউনিয়নের উত্তর চন্দ্রমোহন গ্রামটি নদীতীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা এতই বেশি যে রাতদিন সমান তালে বাড়িঘর ও ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন এর উত্তর চন্দ্রমোহন গ্রামের নদীতীরের মানুষ ঘরবাড়ি ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। নদী ভাঙ্গনে গাছগুলো চলে যাচ্ছে নদীর মধ্যে। কেউ কেউ নদীতীরে বাঁশ ও গাছ দিয়ে বাঁধ তৈরি করে বসতবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, গত তিন মাসে চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের অন্তত ৩টি ওয়ার্ড ভাঙন দেখা দেয়; কিন্তু এখনো স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। উত্তর চন্দ্রমোহন গ্রামের জেলেপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় বাসিন্দা ইয়ানুর ঘরের কিছু জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, নদীটি তাঁদের বাড়ি থেকে প্রায় হাপ কিলোমিটার দূরে ছিল। গত (২২আগস্ট) বিকালে জোয়ারের পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ভাঙন শুরু হয়। হঠাৎ বাড়িঘরের সঙ্গে নদীভাঙনে গাছপালাও বিলীন হয়ে চোখের সামনে নদীতে চলে গেছে। তাঁর ঘরের বেশির ভাগ মালামাল নদীতে চলে গেছে। যেকোনো সময় পুরো গ্রামটি নদীতে চলে যেতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।
একই গ্রামের মোঃ মনির হোসেন বলেন, হঠাৎ ভাঙনের শিকার হয়ে পরিবারগুলো আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন। তাঁদের অনেক দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে; কিন্তু এখানে স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাই মাত্র তিন মাসের মধ্যে কয়েক শ মানুষ গৃহহারা হয়েছেন। চোখের সামনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা কিছুই করতে পারছেন না। তাঁদের দেখার যেন কেউ নেই।
চন্দ্রমোহন গ্রামের বাসিন্দা মোঃ ফরিদ হোসেন হাওলাদার বলেন, গ্রামের উত্তর পশ্চিম পাশ দিয়ে তেতুলিয়া নদী বয়ে গেছে। তিন মাস ধরে নদীতে প্রবল স্রোত বইছে। প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে। পাড় ভেঙে নদীতে আছড়ে পড়ছে। ২০ বছর আগে তাঁর বাড়ি নদীতে চলে যায়। এখন উত্তর চর সিংহেরকাঠী গ্রামে থাকেন। এ গ্রামেও ভাঙন হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত গ্রামের চার ভাগের দুই ভাগ এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে যেভাবে ভাঙন চলছে, তাতে কোনো ব্যবস্থা না নিলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বহু ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চন্দ্রমোহন গ্রামের আয়শা বলেন, আমার বাড়ি এই পর্যন্ত চার বার ভেঙে গেছে; এবার নিয়ে পাঁচবার এখন যে কি করব’ আর কোথায় থাকব? আল্লাহ ভালো জানেন।
লাইলি বেগম বলেন, আমার চার সন্তান’ স্বামী অসুস্থ বসতঘর ভেঙে গেছে, এখন রাস্তার উপর একটি পরিত্যাক্ত দোকানে থাকি; অন্যের গরু ঘরে পাক করি, জানিনা সেখানে কতো দিন থাকতে পারব?
চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি কাজী মোঃ ফিরোজ আলম বলেন, চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য ইউনিয়ন বাসীর পক্ষে দ্রুত টেকসই বাঁধের জন্য সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছি। তিনি বলেন, চন্দ্রমোহন গ্রামের বাসীন্দারা সবাই এখন নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত। উত্তর চন্দ্রমোহন গ্রামের ৪০ পরিবারের লোকজন গত দুই সপ্তাহে নদীভাঙনের শিকার হন। তাঁরা সব হারিয়ে এখন অন্যের বাড়ি ও দোকান এবং খোলা আঁকাশের নিচে বসবাস করেন। এমন বহু পরিবার সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে।
কাজী মোঃ ফিরোজ আলম আরও বলেন, গত বছর আওয়ামী লীগের লোকেরা ভাঙন দেখিয়ে সরকারি কোটি টাকা বরাদ্দ এনে নাম মাত্রা বালুর বস্তা ফেলে নিজেদের মধ্যে টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা করেছে। তাঁরা ইউনিয়ন উন্নয়নের পরির্বতে নিজেদের উন্নয়ন করেছেন। ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ সিরাজুল হক বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন এর উত্তর চন্দ্রমোহন গ্রামের দুই পাশে নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। এমনি কি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির কাছাকাছি ভাঙন চলে এসেছে, যে কোন সময়ে নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে স্কুলটি। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাবেদ ইকবল বলেন, চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন এর বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের স্থানগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমাকে জেলা প্রশাসক স্যারে বিষয়টি দেখার জন্য বলেছেন, আমি শুক্রবার সকালে চন্দ্রমোহন ইউনিয়ন এর নদীভাঙন স্থানগুলো পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নিব।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মাহাবুব উল্লাহ মজুমদার বলেন, বিষয়টি আমার নজরে আছে। আপনারা জেলা প্রশাসক স্যারকে জানান। আমিও স্যারের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলব।
চন্দ্রমোহন নদী ভাঙনের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানিয়েছি। তিনি পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নিবেন।